Advertising
hemel
Advertising
hemel

“জাতীয় উন্নয়নে বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন ও বর্তমান প্রেক্ষিত”

জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ অপরিহার্য। প্রকৃতপক্ষে জাতীয় উন্নয়নে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের সুফল আসে ধীরে ধীরে। আর তাই সেটা অনেক সময় তাৎক্ষনিকভাবে আমাদের চোখে পড়ে না। অথচ অর্থনীতিবিদদের মতে, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে লাভজনক এবং নিরাপদ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডো এবং মার্শালের মতে, শিক্ষা এমন একটি খাত যার কাজ হলো দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে পুঁজির সঞ্চালন ঘটানো। অর্থনীতিবিদ আর্থার শুলজ দেখিয়েছেন যে, প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ করা সম্পদের সুফল ফেরত আসে ৩৫ শতাংশ, মাধ্যমিক শিক্ষায় ২০ শতাংশ এবং উচ্চ শিক্ষায় ১১ শতাংশ।

শিক্ষার অর্থনীতি (ঊপড়হড়সরপং ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ) নিয়ে গবেষণা করে মৌলিক অবদান রাখার জন্য রবার্ট সলো এবং আর্থার শুলজ অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পর্যন্ত পেয়েছিলেন। শিক্ষার সুদূর প্রসারী ফলাফলের দিকটিকে সামনে রেখে চীন দেশে আজও একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে,তুমি যদি স্বল্পতম সময়ে ফল লাভ করতে চাও? তাহলে মওসুমী ফসলের চাষ কর , তবে তুমি এতে ফসল পাবে মাত্র একবার, আর যদি তুমি ১০ বছর ধরে ফল লাভ করতে চাও , তাহলে চাষ কর ফলদার বৃক্ষের,আর যদি তুমি শতাব্দীকাল ধরে ফল পেতে চাও , তাহলে মানুষ চাষ কর। বলা বাহুল্য মানুষের চাষ মানে হলো একটি গণমুখী ও বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন।

শিক্ষা আন্দোলন
১৯৬২ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের চাপিয়ে দেয়া গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষানীতি বাতিল করে বৈষম্যহীন সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণমুখী বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে ছাত্রসমাজ অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিল । ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা। রূঢ় বাসতবতা এবং দ্্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে শুধু সংখ্যায় নয়, গুণগতমান নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে একটি মানানসই বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন সময়ের দাবী।
প্রাথমিক শিক্ষা
দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী দেশে ফিরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশের প্রথম সরকার কর্মকান্ড শুরু করেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। ১৯৭২-৭৩ সালে প্রস্তাবিত ‘কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন’ রিপোর্টে যে সুপারিশমালা দেওয়া হয়েছিল তা বৈপ্লবিক না হলেও উপনিবেশিক চিন্তা চেতনার বিপরীতে যুগোপযোগী এবং বৈষম্যহীন শিক্ষা কাঠামোর দিক- নির্দেশনা ছিল। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে অত্যধিক ঘনবসতি, সীমিত সম্পদ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ-প্রবণতার কারণে অনেক বিদেশি প-িত দেশের টিকে থাকার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যুদ্ধ বিধ্বস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্ব নিয়েই বঙ্গবন্ধু উপলব্দি করেছিলেন প্রাথমিক পর্যায়ে যতদিন শিক্ষার ভিত্তি মজবুত হবে না ,ততদিন এদেশের বিপুল জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করা সম্ভব নয় এবং তিনি এটাও উপলব্দি করেছিলেন প্রাথমিক পর্যায় থেকেই মানসম্মত শিক্ষার কাজ শুরু করতে হবে। তাই তিনি যুদ্ধ বিধ্বস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যার অন্যতম ছিল প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ। ১৯৭৩ সালে একটি ঘোষণায় দেশের ৩৬১৬৫ (ছত্রিশ হাজার একশত পয়ষট্টি) টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করন করে শিক্ষকদের বেতন ভাতার ভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ধনী , দরিদ্র ,শহর গ্রামের শিশুদের একই শিক্ষা কাঠামোর অর্ন্তভুক্ত করে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে বৈষম্যহীন, সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । জাতির পিতার আদর্শের ধারাবাহিকতায় তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ১০ জানুয়ারী ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছিলেন । এর মধ্য দিয়ে এসব বিদ্যালয়ে কর্মরত এক লাখ তিন হাজার ৮৪৫ জন শিক্ষকের চাকরি সরকারি হয়েছিল। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করনের মধ্য দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের দীর্ঘ দুই দশকের আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। দূরীভূত হয়েছিল প্রাথমিক স্তরের সরকারী-বেসরকারি বৈষম্য । সহস্্রাব্দ উন্নয়নের লক্ষ্যে সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অর্জিত হয়ছিল উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
মাধ্যমিক শিক্ষা
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশকে একটি নতুন শিক্ষানীতি উপহার দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই ড. কুদরাত-ই-খুদাকে চেয়ারম্যান করে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। কমিশন জাতীয় শিক্ষার সকল দিক বিবেচনা করে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যাপারে কমিশন একটি বৈষম্যহীন সকলের জন্য শিক্ষার অধিকার ও সুযোগ প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণমুখী বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য দীঘর্ মেয়াাদি সুপারিশ পেশ করে। কিন্তু, কমিশনের প্রতিবেদন অনুমোদনের পূর্বেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তিত হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালে জাতীয় শিক্ষা ও পাঠ্যক্রম কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত শিক্ষাক্রম ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়িত হয়। এটি ১৯৯৬ সালে নতুন পাঠ্যক্রম চালুর পূর্ব পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা রাখে। ১৯৭৮ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সাতটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। দেশে বর্তমানে প্রচলিত মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যসূচি ১৯৯৬ শিক্ষাবছর থেকে চালু হয়েছিল।২০১০ সালের সর্বশেষ শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া পঞ্চম শ্রেণির পাঠদান শেষে সারা দেশে একযোগে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী এবং অষ্টম শ্রেণির পাঠদান শেষে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট বা জেএসসি নামে দুটি পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ২০০৮ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী এবং ২০১০ সাল থেকে জেএসসি পরীক্ষা চালু হয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে এ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পুরোপুরি অর্জিত হলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারী বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ব্যয়ঃ
দেশের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেতন কিংবা ভর্তি ফি নেই। শুধু নাম মাত্র পরীক্ষার ফি নেওয়া হয়। পক্ষান্তরে বেসরকারী কিন্ডার গার্ডেন ও শহরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে শিক্ষার জন্য চড়া মূল্য দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত টিউশন ফি ১২ থেকে ১৫ টাকা, ভর্তি ফি ১,০০০- ১,৪০০ টাকার মধ্যে। সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্বল্প বেতনে অধ্যয়নের সুবিধা ভোগীদের অধিকাংশ অভিজাত শ্রেনী । দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় গুলোর মাসিক টিউশন ফি গড়ে ৮০০-১০০০ টাকা ভর্তি ফি ৮,০০০-২০,০০০ টাকার মধ্যে। উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যয় নামমাত্র। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে চিত্র তার বিপরীত ।
শিক্ষকদের বেতন ভাতায় বৈষম্যঃ
শিক্ষা ব্যবস্থার দুই ধারা সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষকদের মধ্যে বেতন ভাতায় ব্যাপক বৈষম্য বিরাজমান। দিন দিন এ বৈষম্য বেড়ে চলেছে। প্্রাথমিক,মাধ্যমিক ও উচ মাধ্যমিক পর্যায়ে এই বৈষম্য খুবই তীব্র। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের চিত্র তার ঠিক উল্টো। এখানে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মচারীদের তুলনায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক কর্মচারীরা বেশি বেতন ভাতা পেয়ে থাকেন।
সরকারী শিক্ষক/কর্মচারীদের প্রাপ্ত সুযোগ/সুবিধাঃ
দেশের সরকারী প্রাথমিক/ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহে কর্মরত শিক্ষক কর্মচারীরা ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি , জাতীয় বেতন কাঠামো অনুসারে মূল বেতনের ৪৫% বাড়ী ভাড়া ,১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা , ভ্রমন ভাতা,শ্্রান্তি বিনোদন ভাতা, মূল বেতনের সমপরিমাণ ২ টি উৎসব ভাতা, নব প্্রবর্তিত ২০% বৈশাখী ভাতা, স্বল্পসুদে ব্যাংক ঋণ সুবিধা, আবাসন সুবিধা, আজীবন পেনশন,কর্মচারী কল্যাণ ও পরিদপ্তর থেকে চিকিৎসা সহায়তা, ০৮, ১২, ১৫ বছরে পর্যায় ক্রমে ০৩টি টাইম স্কেল সহ যাবতীয় সরকারী সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন। একজন স্নাতক বি.এড ডিগ্রীধারী শিক্ষক মাস শেষে সর্বসাকুল্যে ৪৫,০০০- ৫৫,০০০ এবং টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড প্রাপ্তরা সর্বসাকুল্যে ৬০,০০০-৮০,০০০ টাকা বেতন ভাতা পেয়ে থাকেন।
বেসরকারী শিক্ষকদের প্রাপ্ত সুযোগ/সুবিধাঃ
দেশের মাধ্যমিক ও উচ মাধ্যমিক স্তরের ৯৮% শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেসরকারী ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। অথচ বেসরকারী শিক্ষকরা বৈষম্যের শিকার। স্বাধীনতা উত্তর বেসরকারী শিক্ষকদেরকে (১৯৭৬-১৯৮১) জাতীয় বেতন স্কেলের ৫০% বেতন প্রদানের মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে (১৯৮১-১৯৯০) সালে জাতীয় বেতন স্কেলের ৭০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। এবং (১৯৯১-১৯৯৫)সালে ৮০ শতাংশে (১৯৯৬-২০০০) সালে ৯০ শতাংশে (২০০১-২০০৫)সালে বেসরকারী শিক্ষকদের বেতন ১০০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা সরকারী কোষাগার থেকে প্্রারম্ভিক বেতনের শতভাগ বেতন পেলে ও সরকার প্রদত্ত অন্যান্য সকল আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। শতভাগ প্্রারম্ভিক বেতনের পাশাপাশি ১০০০ টাকা বাড়ি ভাড়া, ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা ,বেতনের ২৫% হারে ২ টি উৎসব ভাতা পেয়ে থাকেন বেসরকারী শিক্ষকরা। প্রাপ্ত বেতন থেকে অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টে ৬% কর্তনের পর একজন স্নাতক বি.এড ডিগ্রীধারী শিক্ষক মাস শেষে সর্বসাকুল্যে ১৬ ,৫০০ এবং টাইমস্কেল প্রাপ্তরা সর্বসাকুল্যে ২২,১৮০ টাকা বেতন পেয়ে থাকেন। বেসরকারী শিক্ষক কর্মচারীরা চাকুরীর মেয়াদ আট বছর পূর্তিতে সমগ্র চাকুরী জীবনে একটি মাত্র টাইম স্কেল পেতেন, ৮ম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর টাইম স্কেল প্রথা রহিত হয়ে যায় । ফলশ্রুতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের বেতন ভাতায় সরকারী -বেসরকারী বৈষম্য আরো প্রকট আকার ধারন করে ।
শিক্ষা খাতে বর্তমান সরকারের অর্জনঃ
শিক্ষা খাতে বিরাজমান সরকারী -বেসরকারী বৈষম্য স্বত্বে ও শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বর্তমান সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ সমূহের মধ্যে অন্যতম হলো-১জানুয়ারী শতভাগ ছাত্রছাত্রীর মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ কার্যক্রম। নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চালু করা হয়েছে উপবৃত্তির ব্যবস্থা। সারাদেশের ত্রিশ হাজার বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন। ১৯৯০ সালে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিশুর শতকরা হার ছিল ৬১ শতাংশে বর্তমানে তা উন্নীত হয়েছে শতকরা ৯৭ ভাগে। শিক্ষার সুবিধা বঞ্চিত গরিব ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট আইন ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে, গঠন করা হয়েছে শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা আর শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে রীতিমতো ঘটে গেছে বিপ্লব যা বিশ্বের বহু দেশের কাছে অনুকরণীয়। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগ, ছাত্র-ছাত্রীর সমতা, নারী শিক্ষায় অগ্রগতি, ঝরে পড়ার হার দ্্রুত কমে যাওয়া সহ শিক্ষার অধিকাংশ ক্ষেত্রই রোল মডেল এখন বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে গেলেও শিক্ষার অগ্্রগতিতে গত এক দশকই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিশ্বব্যাংক, ইউনেস্কো, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামসহ আন্তর্জাতিক দাতা ও গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশের শিক্ষার অগ্রগতিকে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ সমূহের জন্য উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করে বলেছে, শিক্ষায় প্রতিটি পর্যায়ে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। একদশকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও টেকসই। শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে বাংলাদেশ ছুঁয়েছে নতুন মাইলফলক।

পরিশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষা ক্ষেত্রে এতসব অর্জনের পর ও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারী বেসরকারী বৈষম্য আপনার সরকারের অর্জন সমূহকে ম্লান করে দিচ্ছে । দেশের উন্নয়নে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অন্তর্নিহিত শক্তির কারণেই স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের আলোকে শিক্ষাখাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব¡ দিয়ে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছিলেন। শিক্ষা জনগণের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার তৃতীয়তম স্তম্ভ হওয়ায় আর দশটি উন্নত, উন্নয়নশীল দেশের মতো রাষ্ট্রকেই শিক্ষার মুখ্য দায়িত্বে থাকার প্্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মম ভাবে হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের পর মুক্ত বাজার অর্থনীতির নামে ঢালাও বাজারিকরণের স্্েরাতে ঠেলে দেওয়া হয় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে, সেই দিন শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছিল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা রাষ্ঠ্রীয় করনের স্বপ্নকে। অবহেলিত থাকে যায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাস্তর। আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে একটি মধ্যম আয়ের উন্নত দেশে রূপাস্তরিত হতে চলেছে, বিষয়টি এখন আর কল্পনা বা অনুমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই,দেশে শিল্প বিপ্লব চলছে,নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে , বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ত্রিশ হাজার কোটি মার্কিন ডলার, তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের বদৌলতে ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন দৃশ্যমান। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এ ধরনের যে সমস্ত সংস্থা রয়েছে, তাদের সকলেরই অভিমত, বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হবে। আপনার সরকারও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশ বলে বিবেচিত হবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর উন্নত দেশের কাতারে শামিল হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শহর-গ্রাম,সরকারী-বেসরকারী বৈষম্য দূর করে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করনের মাধ্যমেই শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য নিরসন করা সম্ভব । অব্যাহতভাবে এ কাজ চালিয়ে যেতে পারলে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ শুধু একটি মধ্যম আয়ের দেশ হবে না, শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একটি মধ্যম মানের উন্নত শিক্ষিত দেশ বলে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করবে।

Related posts