Advertising
Advertising

২০ জানুয়ারি শুরু হবে দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব ইজতেমা

টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে লাখ লাখ ধর্মপ্রান মুসলমানের কন্ঠে আমিন আল্লাহুমা আমিন ধ্বনিতে মুখরিত আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে রবিবার শেষ হলো এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি, সমৃদ্ধি, ইহলৌকিক ও পরলৌকিক মুক্তি এবং দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার তৌফিক কামনা করা হয়। জীবনের সব পাপ-তাপ থেকে মুক্তির জন্য, পরম দয়াময় আল্লাহর দরবারে অনুনয়-বিনয় করে পানাহ্ ভিক্ষা করছিলেন মুসুল্লীরা।

ক্ষমা লাভের আশায় লাখো মানুষের সঙ্গে একত্রে হাত তুলতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন তাঁরা ভোর থেকেই। বহু মানুষের অংশগ্রহণে ইহলোকের মঙ্গল, পরলোকের ক্ষমা, দেশের কল্যাণ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বিশ্বশান্তি কামনা করা হয় তাবলিগ জামাতের ৫২তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরী মোনাজাতে। এরআগে হেদায়েতী বয়ান করা হয়। প্রথম পর্বের পর দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা হবে আগামী ২০ জানুয়ারি থেকে ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত।

বিশ্ব তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বি ভারতের মাওলানা সা’দ আহমেদ ছোট ছোট বাক্যে আরবী ও উর্দু ভাষায় আখেরী মোনাজাত পরিচালনা করেন। তিনি বেলা ১১টা ১ মিনিট থেকে মোনাজাত শুরু করেন এবং তা চলে ৩৫ মিনিট, অর্থাৎ বেলা ১১টা ৩৬ মিনিট পর্যন্ত। মোনাজাত শুরু হতেই পুরো এলাকা জুড়ে নেমে আসে পিন পতন নীরবতা। খানিক পর পর শুধু ভেসে আসে আমিন, ছুম্মা আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন।

অনুতপ্ত মানুষের কান্নার আওয়াজে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। জীবনের সব পাপ-তাপ থেকে মুক্তির জন্য, পরম দয়াময় আল্লাহর দরবারে অনুনয়-বিনয় করে পানাহ ভিক্ষা করছিলেন তাঁরা। ক্ষমা লাভের আশায় লাখো মানুষের সঙ্গে একত্রে হাত তুলতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন তাঁরা ভোর থেকেই। বহু মানুষের অংশগ্রহণে ইহলোকের মঙ্গল, পরলোকের ক্ষমা, দেশের কল্যাণ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও বিশ্বশান্তি কামনার মধ্য দিয়ে তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে  রবিবার। এবারের প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাতে প্রায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।

এদিকে, আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে রবিবার ভোর রাত থেকেই টঙ্গীর ইজতেমা অভিমুখে শুরু হয় মানুষের ঢল। টঙ্গীর পথে শনিবার মধ্যরাত থেকেই ইজতেমা ময়দানগামী ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মোটর গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মোনাজাতে অংশ নিতে চার দিক থেকে লাখ লাখ মুসুল্লী পায়ে হেঁটেই ইজতেমাস্থলে পৌঁছেন। মোনাজাতের আগেই ইজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হলে মুসুল্লীরা মাঠের আশে-পাশের রাস্তা,অলি-গলিতে অবস্থান নেন।

ইজতেমাস্থলে পোঁছুতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ কামার পাড়া সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মোনাজাতের জন্য পুরনো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন সিট বিছিয়ে বসে পড়েন। এছাড়াও পাশ্ববর্তী বাসা-বাড়ি-কলকারখানা-অফিস-দোকানের ছাদে, যানবাহনের ছাদে ও তুরাগ নদীতে নৌকায়  মুসুল্লীরা অবস্থান নেন। যে দিকেই চোখ যায় সেদিকেই দেখা যায় শুধু টুপি-পাঞ্জাবি পড়া মানুষ আর মানুষ।

ইজতেমাস্থলের চারপাশের ৩-৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। আখেরি মোনাজাতের জন্য রবিবার আশে-পাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অফিস-আদালতে ছিল ছুটি। কোন কোন প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা না করলেও কর্মকর্তাদের মোনাজাতে অংশ নিতে বাধা ছিল না। নানা বয়সী ও পেশার মানুষ এমনকি মহিলারাও ভিড় ঠেলে  মোনাজাতে অংশ নিতে রবিবার সকালেই টঙ্গী এলাকায় পৌঁছেন।

রবিবার আখেরী মোনাজাতের দিন বাদ ফজর থেকে খাস বয়ান করেন বাংলাদেশ তাবলিগের মজলিসে শূরার সদস্য মাওলানা ইউনুস সিকদার। এরপর থেকে মোনাজাতের আগ পর্যন্ত ভারতের মাওলানা সা’দ আহমেদ তাবলিগের গুরুত্ব তুলে ধরে মুসুল্লীদের উদ্দেশ্যে হেদায়তি বয়ান করেন। এসময় ইজতেমাস্থলে আগতরা বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে সেসব বয়ান শুনেন।

হেদায়তী বয়ানে ভারতের মাওলানা সা’দ বলেন, ইসলামে নামাজের স্থান মানুষের দেহের মাথার মতো। নামাজ হলো আল্লাহর হুকুম। আল্লাহর হুকুম পুরা হলে তার ওয়াদা পূরণ হয়ে যায়। যার দ্বীলে আল্লাহর এক্কিন পয়দা হবে, সে আল্লাহর হুকুমকে অগ্রাধিকার দেবে। নামাজের ফজিলত বান্দা তখনই পাবে, যখন কেউ রাসুল (সা.) এর মতো করে নামাজ পড়ে। ভালো মউত তাদেরই হবে, যারা আল্লাহর হুকুম ও রাসুল (সা.)-এর হুকুমমতো চলে।

দ্বীনের ঘরে বসে ইবাদতের চেয়ে বাইরে মেহনত করে ইবাদত বন্দিগী করা অনেক ফজিলত। আল্লাহ তার বান্দাদের দ্বীনের কাজে রাস্তায় বের হতে হুকুম দিয়েছেন। সকলকে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার কথা বলেছেন। আর এ দাওয়াতের জন্য তালিম নিতে হবে। মহল্লায় মহল্লায় মসজিদে বসে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে পরামর্শ করতে হবে। এতে শত্রুও বন্ধু হয়ে যেতে পারে। যিনি এখলাছের সাথে দ্বীনের কাজ করবেন তিনিই কামিয়াব হবেন। আল্লাহকে খুশি করার জন্য কাজ করলে জীবনে সফলতা আসে। আল্লাহর কাছে কান্না-কাটি করে নিজের কৃতকর্মের অনুশোচনার মাধ্যমে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। চোখের পানি ফেলে মোনাজাত করতে হবে। মোনাজাত কবুল হলেই আমরা পাপমুক্ত হব। দুনিয়া ও আখেরাতে ফিরে আসবে শান্তি।

৩৫ মিনিটব্যাপী মোনাজাতের শুরুতে প্রায় ১০ মিনিট আরবিতে দোয়া-দরুদ পাঠ করা হয়। ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে সেসব দোয়া উল্লেখ করে আল্লাহতায়ালার দরবারে মানুষের হেদায়েত কামনা করা হয়। দুনিয়ার মানুষের সুখ, শান্তি, উন্নতি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ প্রার্থনা করা হয়। এরপর বাকি সময় মোনাজাত করা হয় উর্দু ভাষায়। হে আল্লাহ! আমরা নিজেদের প্রতি অনেক অবিচার-অত্যাচার করেছি। হাজারো হুকুম অমান্য করেছি। তুমি আমাদের ক্ষমা করে দাও। তুমি মাফ না করলে আমাদের কোনো উপায় নেই, আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো। তুমি আমাদের উপর রহমতের চাদর বিছিয়ে দাও। তুমি আমাদের প্রত্যেকের গোনাহ মাফ করো।

ঈমানকে মজবুত করে দাও। তোমার প্রিয় বান্দা হিসেবে কবুল করে নাও।  আমাদের হেদায়েত দাও। আমাদের পিতামাতাদের হেদায়েত করো। সমস্ত বিশ্ববাসীকে হেদায়েত করো। যারা জীবিত আছে তাদের ক্ষমা  করো। যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাদেরকেও ক্ষমা করো। ইসলামের জন্য আমাদের কবুল করে নাও। ইসলামের ওপর আমাদের অবস্থানকে দৃঢ় করো, আমাদের ঈমান মজবুত করে দাও। সব ধরনের আজাব-গজব ও শাস্তি থেকে আমাদের রক্ষা করো। আমাদের সকল গোনাহ মাফ করে দাও।

বিশ্ব ইজতেমার মূল আকর্ষণ হচ্ছে আখেরি মোনাজাত। প্রতিবারের মতো এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান মন্ত্রীসহ মন্ত্রী পরিষদের বিভিন্ন সদস্যবর্গ, সাংসদসহ বিভিন্ন ব্যাক্তিবর্গ অংশ গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বঙ্গভবনের দরবার হলে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারী বাসভবন গণভবনে পরিবারের সদস্য ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে সরাসরি সম্প্রচার দেখে মোনাজাতে অংশ নেন।

অপরদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া গুলশানের বাসায় বসে একইভাবে আখেরী মোনাজাতে  অংশ নেন। এদিকে বিশ্ব ইজতেমায় আগত লাখো লাখো মুসল্লির সঙ্গে ইজতেমা ময়দানের শহীদ আহসান উল্লাহ ষ্টেডিয়ামে জেলা পুলিশ প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমে বসে আখেরী মোনাজাতে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক, ধর্ম মন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ। এছাড়াও আখেরী মোনাজাতে বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের কূটনীতিক বৃন্দ, বিভিন্ন রাজনেতিক দলের নেতৃবর্গ শরিক হন। এ ছাড়া পদস্থ সামরিক, বেসামরিক কর্মকর্তাসহ দল-মত, শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মুসলমান আখেরী মোনাজাতে অংশ নেন।

দ্বিতীয় পর্বে যেসব খিত্তায় জেলার মুসল্লিরা অংশ নিবেন: এবারের দুইপর্বের ইজতেমায় অংশ নেয়ার জন্য পুরো ইজতেমা ময়দানকে জেলাওয়ারি নির্দিষ্ট খিত্তায় ভাগ করা হয়েছে। প্রথম পর্বের পর আগামী ২০ জানুয়ারি থেকে দ্বিতীয় পর্বে ১৫ জেলার সঙ্গে ঢাকা জেলার বাকী অংশের মুসল্লিগণ ময়দানের বিশাল চটের প্যান্ডেলের অভ্যন্তরে তৈরী খিত্তায় অংশ নিবেন। এসব জেলার মুসল্লিগণ যেসব খিত্তায় অংশ নেবেন, সেগুলো হলো- ঢাকা জেলা ১ থেকে ৫ নং খিত্তায়, মেহেরপুর জেলা ৬ নং খিত্তায়, ঢাকা জেলা ৭ নং খিত্তায়, বাগেরহাট ৮ নং খিত্তায়,  রাজবাড়ি ৯ নং খিত্তায়, দিনাজপুর ১০ নং খিত্তায়, হবিগঞ্জ ১১নং খিত্তায়, মুন্সীগঞ্জ ১২ ও ১৩ নং খিত্তায়, কিশোরগঞ্জ ১৪ ও ১৫ নং খিত্তায়,  কক্সবাজার ১৬ নং খিত্তায়, নোয়াখালি ১৭ ও ১৮ নং খিত্তায়, বাগেরহাট ১৯ নং খিত্তায়, চাঁদপুর ২০ নং খিত্তায়,  পাবনা ২১ ও ২২ নং খিত্তায়, নওগা ২৩ নং খিত্তায়, কুষ্টিয়া ২৪ নং খিত্তায়,বরগুনা জেলা ২৫নং খিত্তায় এবং বরিশাল জেলা ২৬ নং খিত্তায়।

Related posts